
জীবনের গল্পগুলো বড় অদ্ভুত। মিমের গল্পটাও শুরু হয়েছিল এক রাজকন্যার মতো। মা, বাবার একমাত্র আদরের মেয়ে, যার প্রতিটি আবদার পূরণ করতে বাবা শামসুর রহমান নিজের কষ্টটুকুও কখনো বুঝতে দেননি। পকেটে টাকা থাকুক বা না থাকুক, মেয়ের মুখে হাসি ফোটানোই ছিল সেই বাবার একমাত্র লক্ষ্য।
মিমও তার প্রতিদান দিচ্ছিল দুহাত ভরে। সমাপনী পরীক্ষায় পুরো ইউনিয়নে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে সে যখন উপজেলার সেরা স্কুলে ভর্তি হলো, বাবার খুশি আর ধরে না। প্রতিদিন বাবার মোটরসাইকেলের পেছনে চড়ে স্কুলে যাওয়াটা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় সময়।
কিন্তু নিয়তি ছিল বড়ই নিষ্ঠুর।
একদিন নিরালা দুপুরে হঠাৎ খবর এল, তার বাবা আর নেই। যে মানুষটি সকালে সুস্থ শরীরে অফিসে গেলেন, দুপুরেই তিনি নিথর দেহ। হাসপাতালের এক কোণে শুয়ে থাকা মানুষটিকে সবাই তখন ‘লাশ’ বলে ডাকছে। মিম চিৎকার করে কাঁদছিল, ভাবছিল এটা হয়তো কোনো দুঃস্বপ্ন, চোখ খুললেই বাবা আবার ডেকে বলবেন, “মা, চল স্কুলে যাই।”
কিন্তু কিছু দুঃস্বপ্ন কখনো শেষ হয় না, সেগুলোই হয়ে ওঠে কঠোর বাস্তব। বাবার মৃত্যুর সাথে সাথে মিমের সেই সাজানো পৃথিবীটাও যেন দাফন হয়ে গেল। সময়ের স্রোতে মেধাবী মেয়েটি কোথায় হারিয়ে গেল, কেউ জানল না।
আজ ব্যস্ত শহরের ভিড়ে হঠাৎ একজনকে দেখে থমকে দাঁড়ালাম। ঠিক যেন মিমের মতো দেখতে। শুনেছি তার বিয়ে হয়ে গেছে। যে মেয়েটির ডানা মেলে ওড়ার কথা ছিল, সে কি তবে সংসারের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে নিজের স্বপ্নগুলোকে ভুলে গেছে?
ভিড়ের মাঝে হারিয়ে যাওয়া সেই মুখটি কি সত্যিই মিম ছিল? জানি না। শুধু এটুকু জানি, প্রতিটি বাবার কাছে তার মেয়ে এক একজন রাজকন্যা, কিন্তু বাবার ছায়া সরে গেলে সেই রাজকন্যাদের জীবনটা বড্ড একাকী আর কঠিন হয়ে যায়।